বিএনপি জামায়াতের দূরত্ব বাড়ছে!

ঢাকা : সিলেটে মেয়র পদে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থেকেই গেলেন৷ বিএনপির অনুরোধ এবং নানা তৎপরতার পরও তাঁকে বসানো সম্ভব হয়নি৷ আর এ নিয়ে দুইদলের বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যে দূরত্ব স্পষ্ট আগামী সোমবার সিলেট , রাজশাহী ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন৷ রাজশাহী ও বরিশালে বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী বিএনপি-জামায়াত ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে পরিচিত৷ কিন্তু সিলেটে ব্যতিক্রম৷ আরিফুল হক চৌধুরীকে বিএনপি শুরু থেকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী বললেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি৷ কারণ সেখানে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আছেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের৷ তিনি সিলেট জামায়াতের আমির এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য৷ তার এই প্রার্থীতায় কেন্দ্রের পুরোপুরি সমর্থন আছে৷ এতে বিএনপিতে চলছে চরম অস্বস্তি৷ তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে তা স্পষ্ট৷ জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপি’র নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হয় এমন কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে৷

সিলেটে মেয়র পদে জামায়াতের প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার এক সম্মেলনে বলেন, ‘‘বিএনপি ১৯৯১ সালের নির্বাচন একাই করেছে এবং সরকার গঠন করেছে৷ সুতরাং বিএনপির জেতার জন্য কারো উপর নির্ভর করতে হয় না, বিএনপি সেলফ সাফিশিয়েন্ট জেতার জন্য৷”

এর আগে ২৬ জুলাই ২০ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘‘জামায়াত নেতা শুধু মাত্র একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী৷ দলের পরিচয় বা ২০ দলীয় জোটের সমর্থন প্রত্যাশার দাবি হাস্যকর ও বিভ্রান্তিমূলক৷ ঐ জামায়াত নেতার এ প্রার্থীতা যেমন রহস্যজনক, তেমনি পর্দার আড়ালে উচ্চাকাঙ্খী এক কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতার কলকাঠি নাড়ার খবর আমাদের নিকট সু-স্পষ্ট৷ তাদের এ আত্মঘাতি খেলার পরিণাম তাদেরকেই দিতে হবে৷”
‘জাময়াতের প্রার্থী থাকায় বিএনপি’র প্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন’

বিএনপি নেতাদের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শনিবার রাতে একটি বিবৃতি দেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার৷ তিনি বিবৃতিতে বলেন, ‘‘আমরা সম্প্রতি লক্ষ্য করেছি যে, একটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতি উৎসাহী কতিপয় মিডিয়ার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ২০ দলীয় জোটের দায়িত্বশীল কোনো কোনো নেতা কখনো কখনো অনাকাঙ্খিত মন্তব্য করছেন৷”

মিয়া গোলাম পরওয়ার বিবৃতিতে বলেন, ‘‘জাতীয় ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে৷ যে জাতীয় প্রয়োজনকে সামনে রেখে ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে সেই প্রয়োজনীয়তা এখনো শেষ হয়ে যায়নি, বরং সে প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে৷ জোটের শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ কেউ সম্প্রতি এমনও মন্তব্য করেছেন বলে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে যে, কোনও একটি দল একাই সরকার পরিবর্তন করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যথেষ্ট কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই৷”

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘তিনি (মির্জা ফখরুল) আসলেই এ ধরনের কোনও বক্তব্য দিয়েছেন কিনা, সে ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ আর যদি তিনি এ ধরনের বক্তব্য দিয়েই থাকেন, তাহলে আমি তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯৯১ সালে জামায়াত তার নিজ দলীয় স্বার্থের উর্ধে উঠে সমর্থন দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছিল৷ দেশ ও জাতির স্বার্থে এ ধরনের সমর্থন এবং উদারতা ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা৷”

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে একটি মাত্র সিটিতে জামায়াত নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়েছে৷ বাকি সব কয়টি সিটিতে বিএনপির প্রার্থীদের জামায়াত সমর্থন দিয়েছে৷ একটি মাত্র সিটিতে জামায়াত অংশ নেয়ার কারণে তারা এখন তা নিয়ে ঝড় তোলার চেষ্টা করছে৷”

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘আমরা জোটভুক্ত সব দল এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাব, যেন কারও উসকানির শিকার হয়ে আমরা যেন এমন কোনও বক্তব্য না দেই, যেন যা দেশ ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি হয়৷”
‘কিছু কিছু লোকের কথায় পরিবেশটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান রবিবার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘একমাত্র জাময়াতে ইসলামী ছাড়া ২০ দলীয় জোটের আর কোনো দল চায়নি সিলেটে জামায়াতের কোনো প্রার্থী থাকুক৷ তারা মনে করেন সিলেট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি’র প্রার্থী আরিফুল হকই যোগ্য৷ ২০ দলীয় জোটের নেতারা এ নিয়ে জাময়াতের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন৷ কিন্তু জামায়াত তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে রাজি হয়নি৷ কি কারণে রাজি হয়নি তারাই ভালো বলতে পারবেন৷ তারা তো একটি আলাদা দল৷ তবে এ নিয়ে অনেকেই অসন্তুষ্ট৷”

তিনি বলেন, ‘‘জাময়াতের প্রার্থী থাকায় বিএনপি’র প্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন৷ কারণ জামায়াত না থাকলে বিএনপি’র প্রার্থী ওই ভোটগুলো পেতেন৷ তারপরও জাময়াতের র‌্যাংক এন্ড ফাইলে যেসব ভোটার আছেন তারা বিএনপি’র প্রার্থীকেই ভোট দেবেন৷ জামায়ত প্রার্থী তার ঘনিষ্ঠ লোকজনের ভোট পেতে পারেন৷”

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের গাঁটছড়া বাধার কোনো অভিযোগ আমরা এখনি করতে চাইনা৷ তারা এখনো জোটে আছেন৷ তবে এটা নিয়ে আলোচনা হবে৷”

জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার রবিবার দুপুরে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এটাতো জাতীয় নির্বাচন নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন৷ আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনেক প্রার্থী দিয়েছি আলাদাভাবে৷ তখন কোনো কথা হয়নি৷ সিলেটে নজর পড়েছে, কারণ এটা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন৷ আমরা শুরুতে চারদলীয় এবং এখন ২০ দলীয় জোট হই একসঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের জন্য৷ একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন, একসঙ্গে সরকার গঠন৷ আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য জোট করিনি৷ জোট করেছি জাতীয় নির্বাচনের জন্য৷ এটা খানিকটা মিস প্রোপাগান্ডা, মিস ইন্টারপ্রেটেশন৷”

নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘তাঁর বক্তব্যে ব্যাখ্যা তিনি নিজেই ভালো দিতে পারবেন৷ যারা কোনো দলকে বিলং করেন তারা তাদের মত করে কিছু কথাতো বলবেনই৷”তিনি আরো বলেন, ‘‘আমাদের জোটের ঐক্য অটুট আছে৷ তবে কিছু কিছু লোকের কথায় পরিবেশটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷”

এমন আরো সংবাদ

Back to top button