ভারতের ধর্ষণ আইনে তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার রক্ষা হচ্ছে না

ভারতে কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে অপরাধীর ১০ বছরের সাজার বিধান রয়েছে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সাজা বাড়িয়ে যাবজ্জীবন এবং মৃত্যুদণ্ডেরও বিধান রয়েছে। তবে তৃতীয় লিঙ্গের কেউ ধর্ষণের শিকার হলে ভারতীয় আইনে অপরাধীর শাস্তির বিধান ভিন্ন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের তৃতীয় লিঙ্গ (অধিকার সুরক্ষা) আইন-২০১৯ অনুযায়ী, তৃতীয় লিঙ্গের কেউ শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরাধের মাত্রানুযায়ী তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দুই বছর সাজা ও জরিমানার বিধান রয়েছে। একই দেশে ধর্ষণের ঘটনায় বিদ্যমান আইনের এ ভিন্নতা ব্যাপক বৈষম্যমূলক বলে জানিয়েছেন মানবাধিকার সংস্থা এবং তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করা সংস্থাগুলো।

সংস্থাগুলো বলছে, আইনের এমন বৈষম্যের ফলে বোঝায় যে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো যেন মানুষই না। একই ঘটনায় একজন নারী যে বিচার পাচ্ছেন, তৃতীয় লিঙ্গের কেউ সে বিচার পাচ্ছে না।

সিএনএন’র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডায়না ডায়াস তৃতীয় লিঙ্গের একজন ভারতীয় কিশোরী। কাজ করতেন গোয়া প্রদেশের একটি বারে। তার কাজ ছিল মূলত নাচের মাধ্যমে বারে কাস্টমারদের বিনোদন দেওয়া। একদিন ডায়নার ম্যানেজার এক কাস্টমারের বাসায় যেতে বলেন। নির্দেশ অনুযায়ী সেখানে যান ডায়না। কিন্তু সেখানে গেলে ডায়নাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়।

ডায়না বলেন, ‘আমার সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করা হয়। সেদিন আমাকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনা আমি পুলিশকে জানাই। কিন্তু লাভ হয়নি। তৃতীয় লিঙ্গের বলে আমাকে কেউ সেদিন পাত্তাই দেয়নি।’

ডায়নার বয়স এখন ৩৬। কাজ করছেন তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার সুরক্ষা নিয়ে। ওয়াজুদ নামের একটি সংস্থাও চালু করেছেন। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অধিকার সুরক্ষা কয়েকটি কমিটিতে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। এসব সংস্থাগুলোর অধিকার সুরক্ষার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

২০১৪ থেকে ২০১৫ সালে তৃতীয় লিঙ্গের পাঁচ হাজার মানুষের ওপর একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপে অংশ নেওয়া পাঁচ ভাগের একভাগ জানিয়েছে, ওই সময়ে ১২ মাসের মধ্যে তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু ডায়নার মতোই অনেক অধিকারকর্মীরা জানিয়েছে, এসব ঘটনার জন্য ভারতীয় আইনে অপরাধীদের বিচার প্রায় অসম্ভব। ভারতে যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে মনে করা হয়, অপরাধী কেবলই একজন পুরুষ আর ভুক্তভোগী কেবলই একজন নারী।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে ধর্ষণের শাস্তির ক্ষেত্রে আইনের কঠোরতা আনা হয়েছে। আলোচিত একাধিক ধর্ষণের ঘটনায় এবং ভারত জুড়ে সেগুলোর ব্যাপক প্রতিবাদ হলে সরকার শাস্তির ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছে। তবে তৃতীয় লিঙ্গের কেউ একই ঘটনায় ভুক্তভোগী হলে সেজন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেই।

ভারতের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিচারক স্বাতী বিধান বড়ুয়া বলেন, ‘ভারতে বিদ্যমান ধর্ষণ আইনে কোনো নারী এবং তৃতীয় লিঙ্গের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। এর ফলে এমনটি বোঝায় যে তৃতীয় লিঙ্গের কেউ যেন মানুষই না।’

গত অক্টোবরে ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য সমানাধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টে একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রণালয়কে সে ব্যাপারে জবাব দিতে বলা হয়। পরে সরকারের পক্ষ থেকে ওই বিষয়ে কোনো মন্তব্য আসেনি।

১৮৬০ সালে প্রথম ভারতীয় পেনাল কোডে ধর্ষণের শাস্তির বিষয়ে ধর্ষণ আইন নথিভুক্ত করা হয়। তারপর থেকেই নির্যাতিতার পক্ষে বিদ্যমান ধর্ষণ আইন সংশোধন করে যাচ্ছে সরকার।

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছিলেন। রায়ে ভারতের তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়কে নারী বা পুরুষ নয়, নিজস্ব পরিচয় ধারণ করার অধিকার দিয়েছিল। আদলত ‘ট্রান্সজেন্ডার’, ‘থার্ডজেন্ডার’ নামে তাদেরকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয়। ডায়না জানিয়েছে, আদালতের ওই নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তৃতীয় লিঙ্গের নিজস্ব পরিচয় বহন করার ক্ষেত্রে।

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button