কীভাবে তৈরি হচ্ছে করোনার ভ্যাকসিন

মহামারি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে উন্নত বিশ্বের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। সেগুলোর ট্রায়াল পরিচালনা করা হয়েছে। এসব ট্রায়ালের ফলাফল নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তা শতভাগ সফল না হলেও ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে। সম্প্রতি করোনা ভ্যাকসিন প্রস্ততকারী তিনটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের তৈরি টিকা ব্যাপক সফলতা পেয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক মাসের ব্যবধানে যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন নিয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ৬২ শতাংশ কার্যকারিতা দেখা গেছে। কিন্তু করোনা টিকার ফুল ডোজ মেনে একমাস পরে যারা আরও হাফ ডোজ নিয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে গড়ে ৭০ শতাংশ কার্যকর অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের যে সফলতার কথা বলা হয়েছে ওই একই সময়ের মধ্যে ফাইজার এবং মডার্নার ভ্যাকসিন ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর। ফাইজার এবং মডার্নার ভ্যাকসিনগুলোর উৎপাদনের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে অ্যাস্ট্রাজেনেকা তাদের থেকে একটু ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। সারাবিশ্বে এসব ভ্যাকসিনের ছয়টি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থন পাচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আরও ডজনখানেক করোনার টিকা ডেভেলপ হচ্ছে।

ফাইজার ও বায়োএনটেক

ফাইজার এবং এর জার্মানভিত্তিক অংশীদার বায়োএনটেক ভ্যাকসিন তৈরি করতে একটি নতুন পদ্ধতির ব্যবহার করছে। তারা ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে ‘ম্যাসেঞ্জার আরএনএ বা এমআরএনএ’ ব্যবহার করছে। এ প্রক্রিয়াটি কয়েক বছর আগে একটি মহামারি ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল।

এক্ষেত্রে সবথেকে বেশি প্রয়োজন পড়ে মহামারি সৃষ্টিকারী ভাইরাসটির জিনগত ক্রমবিন্যাস। ঠিক ভাইরাসটি নয়, বিশেষজ্ঞরা এর জিনগত পরিবর্তনকেই পর্যালোচনা করে ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছেন। বায়োএনটেক এর গবেষকরা জেনেটিক মেটেরিয়ালের একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করেন ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে। ক্ষুদ্র এ অংশটিই করোনা ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য, জিনগত পরিবর্তন প্রকাশ করে।

মডার্না

মডার্নার ভ্যাকসিনও এমআরএনএ ভিত্তিক। এমআরএনএ হলো সেলের সফটওয়্যারের মতো। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানিয়েছে। ফাইজার এবং বায়োএনটেকের ভ্যাকসিনের মতো এটি ‘স্পাইক প্রোটিন’ গঠনে সেলগুলোর জন্য কোড তৈরি করে। বিজ্ঞানিরা খুব সতকর্তার সঙ্গে ভাইরাসটির একটি ক্ষুদ্র অংশ বেছে নিয়েছিলেন।

তারা ভেবেছিলেন সময়ের পরিবর্তনে হয়তো তার খুব বেশি মিউটেশন কিংবা পরিবর্তন হবে না। কিন্তু দেখা গেছে ভাইরাসটি স্পাইক প্রোটিন ব্যবহার করে সেলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা সচল থাকে।

মডার্না তাই এমআরএনএ রক্ষায় ‘লিপিড ন্যানোপার্টিকল’ এর জন্য একটি আলাদা ফর্মুলা ব্যবহার করে। এ বিষয়গুলো প্রতিযোগিতার কর্পোরেট বাজারে অত্যন্ত গোপনীয়। মডার্না জানিয়েছে, ভ্যাকসিনটি মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (মাইনাস ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া ২ ডিগ্রি থেকে ৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় এটি ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা

ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি টিম অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনটি তৈরি করছে। এটিকে ‘ভেক্টর ভ্যাকসিন’ও বলা হয়। অ্যাডেনোভাইরাস নামে একটি সাধারণ ঠাণ্ডাজনিত ভাইরাস ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি।

করোনভাইরাস থেকে স্পাইক প্রোটিন কোষে নিয়ে যেতে সাধারণ এ ভাইরাসটিকে কাজে লাগিয়ে ভ্যাকসিন তৈরি করছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা। এটি তৈরি করতে মানবদেহকে কাজে লাগানো হয়। অ্যাডেনোভাইরাস শিম্পাঞ্জিকে সংক্রমিত করতে পারে তবে মানুষকে খুব একটা অসুস্থ করতে পারতে পারে না।

এটি এমনভাবে রূপান্তরিত করা হয় যাতে ভাইরাসটির অনুরূপ ভাইরাস তৈরি না হয়। ভ্যাকসিনটি দাম পড়বে কম। এ ছাড়া পৃথিবীর যেকোনো দেশে সহজে স্থানান্তর করা যাবে। একটি নির্দিষ্ট মানের তাপমাত্রায় এটি ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।

জনসন ও জনসন’স ভ্যাকসিন আর্ম জানসেন ফার্মাসিউটিক্যালস

জনসনের করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন একটি ‘রিকম্বিন্যান্ট ভেক্টর ভ্যাকসিন’। অ্যাস্ট্রাজেনেকার মতো এটি অ্যাডেনোভাইরাস ব্যবহার করে তবে এর একটি ডোজ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। এটি জেনেটিক্যালি অ্যাডেনোভাইরাস ২৬ এর সংস্করণ।

এর ফলে সাধারণ সর্দি হতে পারে তবে জিনের কার্যক্ষমতার ফলে ভাইরাসটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। জনসনের ভ্যাকসিনটি নিয়ে আগেও পরীক্ষা করা হয়েছিল। এটি ইবোলা ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি করতে কাজে লাগানো হয়েছিলো যা গত জুলাইয়ে ইউরোপিয়ান কমিশনের অনুমোদন পায় ।

নোভাভ্যাক্স

মেরিল্যান্ডভিত্তিক বায়োটেকনোলজি সংস্থা নোভাভ্যাক্স। এটি ‘প্রোটিন সাবইউনিট’ ভ্যাকসিন তৈরি করছে। ভাইরাস জাতীয় ‘ন্যানো পার্টিকল’কে ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে তারা ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। প্রতিষ্ঠানটি একটি সত্যিকারের কার্যকরী ভাইরাস তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। নবজাতকদের হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের যে ভ্যাকসিন দেওয়া হয় তা ‘প্রোটিন সাবইউনিট ‘ গ্রুপের।

সানোফি এবং গ্ল্যাক্সো স্মিথলাইন ভ্যাকসিন

এ প্রতিষ্ঠানটিও একটি ‘প্রোটিন সাবইউনিট’ ভ্যাকসিন তৈরি করছে। ‘গ্ল্যাক্সো স্মিথলাইন অ্যাডভাইভেন্ট’ এর সঙ্গে এটি সানোফির ফ্লুব্লুক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

সিনোভ্যাক এবং সিনোফর্ম

সিনোভাক এবং সিনোফর্ম একটি চাইনিজ কোম্পানি। তারা সবথেকে পুরোনো পদ্ধতি ব্যবহার করছে ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি একটি অকার্যকর ভাইরাস ব্যবহার করে ভ্যাকসিন তৈরি করছে।

স্পুটনিক

রাশিয়ার করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনটি একটি ‘অ্যাডেনোভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন’। একটি তৈরিতে অ্যাডোনোভাইরাস ৫ নামে একটি সাধারণ ভাইরাস ব্যবহার করছে রাশিয়া।

এমন আরো সংবাদ

Check Also
Close
Back to top button