গুজব মহামারীর শেষ কোথায়?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার গুজবে কুমিল্লার মুরাদনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে একটি ফেসবুকের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন কথোপকথন ধরেই ডালপালা মেলে গুজবের, যা শেষ হয় ভাঙচুর আর আগুন ধরিয়ে। ঘটনাটি গত রোববারের।

এ ঘটনার দুই দিন আগে ধর্ম অবমাননার গুজব রটিয়ে আবু ইউনুস মোহাম্মদ শহীদুন নবী জুয়েল নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা এবং পরে তার লাশ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এ বর্বোরচিত ঘটনা ঘটে।

শুধু ধর্ম অবমাননাই নয়, করোনাভাইরাসের আক্রমণের শুরু থেকেই এই ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে কত রকমের ওষুধ ও পথ্য আবিষ্কারের হিড়িক যে পড়ে তার ইয়ত্তা নাই। করোনা ঠেকাতে থানকুনি পাতা, ঘন ঘন চা খাওয়া, কখনো বলা হচ্ছে এই রোগ গরিবদের জন্য না বা করোনা শুধু অবিশ্বাসীদের আক্রান্ত করবে। কখনো রসুন-আদা দিয়ে গরম পানি খাওয়ার গুজব ছড়ানো হয়েছে। সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি হলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, এই বার্তাও হু হু করে মানুষের কানে কানে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে গুজবেরও প্রসার ঘটছে। আগে হয়তো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় গুজবের মহামারী ছড়িয়ে পড়ত, এখন পুরো দেশই শিকার হচ্ছে গুজব নামক প্রযুক্তির গজবের। কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই প্রতিক্রিয়া দেখানো হচ্ছে। মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে কোনো কোনো এলাকা, পিটিয়ে আগুনে পুড়ে মেরে ফেলা হচ্ছে নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে, অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে বাজার, অশান্ত হয়ে উঠছে দেশ।

ফলে গুজবের মহামারীতে চার দিকে অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে; অস্থিরতা বাড়ছে। গুজব ঠেকাতে র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট তাদের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করেছে। গুজব ছড়ানো আইডি শনাক্ত করে নেয়া হচ্ছে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা।

এ দিকে পুলিশ সদর দফতর বলছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল স্পর্শকাতর ধর্মীয়সহ নানা বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও জনশৃঙ্খলা বিনষ্টের চেষ্টা করছে। দেশের সাধারণ মানুষ শান্তিপ্রিয়। তারা যেকোনো নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, বর্বরতা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে। কোনো প্রকার গুজবে কান না দিতে এবং যেকোনো তথ্য ও সংবাদ যাচাই ব্যতীত বিশ্বাস না করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি মিথ্যা ও গুজবে কান না দিয়ে সত্যতা যাচাই করতে ৯৯৯-এ কল করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

মানবাধিকার কর্মী, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা যে সমাজে বিরাজ করে সেখানে বিভিন্ন ধরনের গুজবের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সুশাসনের অভাবে গুজব ছড়াতে থাকে যা পরে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সম্প্রীতিবোধ, নাগরিকবোধ একই সাথে সমাজবোধ সৃষ্টি করার জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একসাথে কাজ করবে, পাশাপাশি রাষ্ট্রে যখন সর্বোচ্চ মানবিকতার জয়যাত্রা আমরা লক্ষ করব তখনই কিন্তু গুজবমুক্ত দেশ দেখতে পাব।

সম্প্রতি ফ্রান্সে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা: ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করায় বাংলাদেশসহ বিশ্বে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার বেশির ভাগই ছিল গুজবনির্ভর। তাই আর কেউ যাতে এমন গুজবের শিকার না হয় সেজন্য কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ফেসবুকের বড় বড় গ্রুপ ও পেজের পোস্টে নজরদারি শুরু করেছে। কোনো আক্রমণাত্মক ও রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট দেখলেই সাথে সাথে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ফেসবুকের কাছে পোস্ট মুছে দেয়ার আবেদন করছে তারা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গুজব ছড়িয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা এর আগেও হয়েছে। তাই আর যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সে লক্ষ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান বলেন, সামাজিক অস্থিরতা যে সমাজে বিরাজ করে সেখানে বিভিন্ন ধরনের গুজবের সৃষ্টি হয়। একটা রাষ্ট্র যখন গণতান্ত্রিক না হয়, দেশে যখন গণতন্ত্রের অভাব সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হয় তখন মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।

তিনি বলেন, মানুষ যখন তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না, সুশাসন থেকে বঞ্চিত হয় তখন অস্থিরতা মানুষকে ঘায়েল করে। তখন বিভিন্ন ধরনের গুজব আকাশে বাতাসে ছড়াতে থাকে। কখনো কখনো সেগুলো ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

গুজবের প্রচলনকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা উল্লেখ করে নাসির উদ্দিন এলান বলেন, কোনো ধরনের সত্যতা যাচাই না করে একটা লোককে চোর গুজব তুলে মারধর করা হয়। গণপিটুনি দেয়া হয়। দিন দিন এ ঘটনা বাড়ছে, যা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। একটা রাষ্ট্রের ইনস্টিটিউশনগুলো যখন অকার্যকর হয়ে যায় তখন মানুষ সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে বাস করে। তখন বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ায়; যার শিকার হয় সাধারণ মানুষ।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, আমাদের দেশে গুজবের যে বৈশিষ্ট্য তা হলো এক একটা সময় এক একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুজব সংঘটিত হয়। কোনো কোনো সময় দেখা যায় সেই ঘটনার গুজব দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কখনো অন্য দেশে তৈরি হওয়া কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গুজব অনেক বেশি ছড়িয়ে যেতে পারে।

যেকোনো দেশে গুজব তৈরি হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ হলো যদি ওই সমাজে গুজবের একটি সংস্কৃতি চালু থাকে এবং সেই ঘটনাগুলোর যদি বিচার যথাযথ সময়ে বা সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে না হয়। আর একটি হলো সেই গুজব প্রতিরোধে যদি রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্যোগ একই সাথে সামাজিক কোনো কার্যক্রম না থাকে। তাহলে গুজবের ঘটনা ঘটবেই।

তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আমাদের পরিবারগুলো একই সাথে সামাজিক অনুশাসনের কথা বলেছি এই জায়গাগুলোতে মানুষকে সঠিকভাবে বড় করার বা দায়িত্ববান করার জায়গাটি তৈরি করতে হবে। এই জায়গাটি বাংলাদেশে একেবারেই নেই। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় কোনো লক্ষ্য নেই সামাজিকভাবেও নেই।

আমরা একটা লক্ষ্যহীন জাতি। সামাজিকভাবে সাংস্কৃতিকভাবে এখানে ক্যারিয়ার বলতে আমরা বুঝি প্রচুর টাকা পয়সা । যে যত বেশি বেতনে চাকরি করছে তার ক্যারিয়ার তত ভালো। একজন ভালো মানুষের মূল্যায়ন যখন সমাজে কমে যায় তখন কিন্তু বিভিন্ন ধরনের অগ্রহণযোগ্য এবং অপ্রত্যাশিত আচরণে সমাজ ভরে যায়। তিনি বলেন, মানুষের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে সামাজিক উদ্যোগ দরকার।
আমাদের দেশেতো সামাজিক ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ খুবই কম। আমরা সব সময় বলি সামাজিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো হোক এবং মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা, সম্প্রীতিবোধ তৈরি করতে হবে। আর এ সম্প্রীতিবোধ নাগরিকবোধ একই সাথে সমাজবোধ তৈরি করার জন্য রাষ্ট্র সমাজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একসাথে কাজ করবে এবং রাষ্ট্রে যখন সর্বোচ্চ মানবিকতার জয়যাত্রা আমরা লক্ষ করব তখনই কিন্তু গুজবমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে পাবো।

ইসলামের দৃষ্টিতে গুজবের বিষয়ে বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম ও ভারপ্রাপ্ত খতিব মাওলানা মুহিউদ্দিন কাসেম বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুক যথেষ্ট, সে যা শোনে তা বর্ণনা করে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো। অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, না হলে তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সূরা : হুজরাত, আয়াত : ৬) যদিও এই হাদিস ও আয়াতের প্রেক্ষাপট ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু আয়াত ও হাদিসকে একসাথ করলে আমাদের শিক্ষাগ্রহণের বিষয় হলো কোনো ঘটনা যখন ঘটবে তখন তার সত্যতা যাচাই করতে হবে।

তিনি বলেন, অন্যায় সর্বাবস্থায় অন্যায়, অপরাধ সর্বাবস্থায় অপরাধ, তবে এ অপরাধের কারণে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন কোনো শাস্তির শিকার না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখাটা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। সুতরাং যারা ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিবে তারা আমাদের জীবনের শক্র তবে তাদের শাস্তি দেয়ার জন্য আমাদের আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার নেই। তাদের শাস্তি দেয়ার জন্য রাষ্ট্রের প্রশাসন আছে তারা ব্যবস্থা নিবে।

তিনি বলেন, খেয়াল রাখতে হবে গুজবকে সাইনবোর্ড করে কোনো অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায়। গুজব রটিয়ে কোনো নিরপরাধ মানুষকে যেন শাস্তি না দেয়া হয়। আবার গুজবকে ভিত্তি করে ইসলামের বদনামও একটা সম্প্রদায় করতে পারে এমন সুযোগও যেন কেউ না পায়। মনে রাখতে হবে, কোনো কথা শুনেই প্রচারের প্রবণতা মানুষকে মিথ্যায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। ফলে সে পৃথিবীতে লজ্জিত হয় এবং পরকালেও তার জন্য রয়েছে শাস্তির বিধান।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, র‌্যাবের একটি দক্ষ ও চৌকস সাইবার মনিটরিং টিম রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক সব সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি করছে। যদি কেউ গুজব সৃষ্টির চেষ্টা করে তাকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় নেয়া হবে। এ ছাড়াও সাধারণ মানুষ যেকোনো তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে র‌্যাবের ভেরিফাইড পেজে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো: সোহেল রানা বলেন, সম্প্রতি দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কয়েকটি সম্পূর্ণ গুজবসৃষ্ট নৃশংস ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে ও নিরীহ মানুষের প্রানহানি ঘটেছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিপ্রায়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়সহ নানা বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও জনশৃঙ্খলা বিনষ্টের চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, বর্বরতা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে। কোনো প্রকার গুজবে কান না দিয়ে এবং যেকোনো তথ্য ও সংবাদ যাচাই ব্যতীত বিশ্বাস না করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বর্বর প্রবণতা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের সব বেআইনি কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করা হবে। যেকোনো তথ্য ও সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগের পাশাপাশি নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানান এআইজি।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button