নীলক্ষেত কে আমি বলি নিরব জ্ঞানভাণ্ডার

pre loderচারমাস পর হাঁটতে হাঁটতে আজ কলাবাগানের বাসা থেকে নীলক্ষেত গেলাম! নীলক্ষেতের প্রতি অন্যরকম পক্ষপাত যে আছে, তা নিয়ে অন্য কোনো সময় বলা যাবে। নীলক্ষেত কে আমি বলি নিরব জ্ঞানভাণ্ডার। এখানে লাখো বইয়ের সমাহার! দেশ-বিদেশের নামকরা লেখকদের বই এখানে মেলে সবচেয়ে কম দামে। দুনিয়ার আর কোথাও হয়ত এমন সস্তায় মূল্যবান বই পাওয়ার জায়গা নাই! এখানকার বই পড়ে বড় হয়ে এ দেশের কত শত মানুষ যে দেশ-বিদেশে বড় বড় অবস্থানে চলে গেছে, তার হিসাব নাই।
পড়ন্ত বিকেল বেলা। হেঁটে চলেছি। বসিরউদ্দিন রোড-কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড ধরে নীলক্ষেত। উপরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, যেন মা-মরা ছোট মেয়েটির মতো মুখ ক’রে চেয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফোটাও পড়ল কিছুক্ষণ। হয়ত এটি তার চোখের জল। আমি হাঁটছি। হাঁটতেই আমার বেশি ভাল লাগে। আমি মাঝারি গড়নের হলেও কীভাবে যেন খুব দ্রুততায় হাঁটতে পারি! আমি দেখেছি আমার চেয়ে অনেক লম্বা মানুষজনও আমার সাথে হেঁটে পারে না। সে হিসাবে আমার হাঁটার জন্য কলাবাগান থেকে নীলক্ষেত— এই পথটি দীর্ঘ নয়। এরচেয়ে দূররাস্তায়ও এই শহরে হেঁটেছি আমি।
করোনা সতর্কতা ত বটেই, অন্য বিবিধ কারণে বাসা থেকে বের হয়েই রাস্তায় বাড়তি মনোযোগ দিলাম। সেই ছিয়ানব্বই থেকে এই শহরে দেখছি, মানুষ বাড়ছে আর বাড়ছে। এই চাপটা চলতিপথের হাঁটুরেদের ওপরও পড়ছে। আমি সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি, ফুটপাতে হাঁটার কমন একটি সমস্যা হলো প্রায়শই লোকজন দেখি আমার ওপরে এসে পড়ে। এই সমস্যাটা কিন্তু সেই ছিয়ানব্বই থেকে শুরু করে দুই হাজার দশের দিকেও তেমন একটা ছিল না। এটি ক্রমে ক্রমে বেড়েছে। এখন হাঁটতে গেলে তিন কোটি মানুষের ঢাকায় মানুষের গায়ে গা লেগে যাবার দশা! এই করোনাকালে এই গা-ঘঁষা এড়িয়ে চলবার জন্যই বাড়তি মনোযোগ দিলাম চলতি পথে। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলাম না।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আগের মোড়ে হুট করে চলে এলেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। তিনি তিন চারফুট দূরে থাকতেই খেয়াল করলাম, তিনি মাত্রা ছাড়া গতিতে আমার দিকেই আসছেন। অথচ তিনি তাকিয়ে আছেন রাস্তার ওপারের দিকে! তার ওই গতিবিধি দেখে এরমধ্যেই আমি দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। শেষ রক্ষা হয়নি। গাড়িও তবু ব্রেক কষা যায়, কিন্তু এমন উদাসী মানুষের দেহখানিকে ব্রেক কষে দেবে কে! সে-ও পারল না ব্রেক কষতে। পড়ল এসে আমার গায়ে! শুধু একবার অসহায়ের মত তাকালাম তার দিকে। তিনি স্যরি টরি কিছু না বলে রাস্তা পার হয়ে চলে গেলেন।
করোনার আগে আর এখনকার মধ্যে এই পার্থক্যটা বেশি করে চোখে পড়ল যে, মানুষ চলাফেরা করছে, কিন্তু মনোযোগ পথের দিকে নাই! হয়ত আর্থিক সঙ্কটসহ নানা কথা চিন্তা করতে করতে তারা পথে নেমেছে। হয়ত তার কোনো স্বজন করোনার সাথে লড়ছে, বা সে নিজেও আক্রান্ত কিনা নিজেই জানে না।
ভাবলাম, আরও সতর্ক হতে হবে। এখানে ত কেবল শুরু। সামনে আছে গাউছিয়া-চন্দ্রিমা! সাবধান হিমেল!
নিউমার্কেটের আগে প্রথম ওভারব্রিজটির নিচে গিয়ে পৌঁছালাম। ভেবেছিলাম মানুষজন হয়ত কমই থাকবে। কিন্তু আমার ধারণাটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণার মতো হয়ে গেল। দেখি বিপুল মানুষের ভীড়। জনারণ্যে যথারীতি মেয়েরাই বেশি। ওখানে গিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার তাড়াহুড়োর চেষ্টা করা, আর হিমালয় পর্বতকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করা একই! হিমালয়কেও বোধয় ঠেললে দু-চার ফুট সরানো যাবে! কিন্তু এখানকার ভীড় ঠেলে কখনো আগানো যাবে না। করোনাকালের আগের আর এখনকার চিত্রের কোনো পার্থক্য পেলাম না। মেয়েরা ধূমসে কেনাকাটা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে একেকজন। এদেরই কয়েকজন শপিংয়ের বড় বড় ব্যাগ নিয়ে ভীড়ের মধ্যে ঢুকেছে। আমি কোনওমতে সেখান থেকে সামনে এগিয়ে বলাকা সিনেমা হলের দিকে গিয়ে দম নেওয়ার পরিকল্পনা করলাম। এমনিতে নাকের ওপর থাকা মাস্কটির কারণে নিঃশ্বাস প্রায় আটকে যাচ্ছে। যে টুকু শ্বাসপ্রশ্বাস পাচ্ছিলাম, এই ভীড় সেটুকও কেড়ে নেবে বলে মনে হল! এ-ই যখন অবস্থা, এরমধ্যেই বাঁ পাশ থেকে হঠাৎ তীব্র এক ধাক্কা! চোখের সানগ্লাসটা প্রায় ছিটকে যাচ্ছিল আমার। কোনও মতে সানগ্লাসটি ধরে বাঁপাশে তাকিয়ে দেখি, মাস্কপরা দুটি ভারী মেয়ে! তারা তাদের চেয়েও আরও ভারী শপিংব্যাগ ভর্তি করে একেবারে কাধে তুলে নিয়ে সামনে আগাচ্ছে বীরদর্পে। ভাল লাগল। সাহসী দৃশ্যে মেয়েদের দেখলে আমার কেন যেন ভাল লাগে। খেয়াল করে দেখলাম, তাদের ব্যাগের সামনে যারাই পড়ছে, তারাই ধাক্কা খাচ্ছে!
ওখান থেকে বের হতে পারলাম। সামনে এগিয়ে বলাকার সামনে মিডনাইট সান-২ রেস্টুরেন্টের মোড়ে দেখি এক চাচা ব্যাগ বিক্রি করছে। মনে পড়ল, শিল্পী কাপড় রাখার জন্য কয়েকদিন ধরে এরকম একটা ব্যাগের কথা বলছিল। চাচাকে বললাম, এখানে কতক্ষণ আছেন? নীলক্ষেতে কিছু কাজ আছে, যাওয়ার পথে ব্যাগ কিনে নিয়ে যাব। চাচা দরদাম জানিয়ে দিলেন। সস্তাই মনে হল।
কিছু প্রিন্টিংয়ের কাজ ছিল। করলাম। ওই দোকানেই বরাবর প্রিন্টিংয়ের কাজ করি। ঘন্টাখানেক সময় লাগল সেখানে। দাম মিটিয়ে যখন বের হব, তখন দেখি দোকানির মুখে মৃদু হাসি! মানে মুখে মাস্ক ও চোখে সানগ্লাস থাকার কারণে এতক্ষণ আমাকে চেনেনি। এবার চিনে মুখটা তার লম্বাটে থেকে চ্যাপ্টা হয়েছে এবার!
ওখান থেকে বেড়িয়ে কিছু ফটোকপি করালাম। ২৫ কপি ফটোকপির কথা বলা হয়েছে। সে ইচ্ছাকৃতভাবে করে ফেলেছে ৫০ কপি! দাম মিটিয়ে নিতে বলেছিলাম, কিন্তু বলেছিল, যা দিবেন, তা-ই নেব। কিন্তু দাম দেওয়ার সময় সে অন্য দোকানের চেয়েও বেশি নিল। আমি তার চাহিদামত টাকা দিয়ে চলে এলাম। ভাবলাম, রিজেন্ট সাহেদের মতো লোক সব পেশাতেই আছে!
ফেরার পথে মিডনাইট সান-২ এর মোড়ে এসে দেখি সেই চাচা নেই! খারাপ লাগল। পাশের এক বইয়ের দোকানিকে বললাম, এখানে যে চাচা ছিল, তিনি কই? দোকানি একটু বাঁকা হাসি দিয়ে টহলরত একটি পুলিশ ভ্যান দেখিয়ে বললেন, ওই যে দ্যাখেন না! ওনারা এসেছে, চাচার এখানে দাঁড়ানো নিষেধ। আমি বললাম, কিন্তু আরও অনেক হকার ত এখানে এখনও নানা জিনিস বিক্রিবাট্টা করছে! দোকানী বলল, যারা নিয়মিত টাকা দেয়, তারা করতে পারবে। ওই চাচা হয়ত টাকা দেয় না।
বইয়ের দোকানী তার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি কলাবাগানের পথ ধরলাম। পথেই পেয়ে গেলাম সেই ব্যাগ। কেনা হল। কিন্তু চাচার কাছ থেকে ব্যাগ কিনতে পারিনি বলে মনটা খারাপ লাগল যদিও।
লুৎফর রহমান হিমেল
লুৎফর রহমান হিমেল

নিউজম্যান | সমালোচক | লেখক | গবেষক |

এমন আরো সংবাদ

Check Also
Close
Back to top button