ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপর আঘাত

সীমিত আয়ের লোকদের পক্ষে গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট কেনা কঠিন। তাই সঞ্চয় কেন্দ্র করেই আরেকটু ভালো চলা কিংবা স্বপ্নপূরণের চেষ্টা থাকে তাদের। আবার এই শ্রেণির অনেক মানুষ আছে- যারা তাদের সম্পদ সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে না। তাই ক্যাশ বা নগদ অর্থের সঞ্চয়ই তাদের প্রধান অ্যাসেট বা সম্পদ। এ প্রক্রিয়াটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অবশ্যই দুশ্চিন্তার কারণ।

ব্যাংকের চেয়ে সুদের হার বেশি হলে এবং অন্যান্য সঞ্চয় স্কিম থেকে ভালো সুযোগ-সুবিধা পেলে সঞ্চয়পত্র কেনায় আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা সীমিত আয়ের লোকদের আয়ের একটা উৎস। কারণ ব্যাংকের ৬ শতাংশ সুদ দেওয়ার কথা। কিন্তু সঞ্চয়পত্রে পাওয়া যেত ১১ শতাংশের বেশি। সরকার সম্প্রতি এই সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে ১৫ লাখ টাকার ওপরে কেনা সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হয়েছে। অথচ ১৫ লাখ টাকা এই মুহূর্তে তেমন কিছু নয়। ৩০ লাখ টাকার ওপরে সুদের হার আরেক ধাপ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই টাকাও বেশি কিছু নয়। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সঞ্চয়পত্রের সুদ বাবদ সরকারের খরচ এখন বাড়ছে, সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি হওয়ায় একশ্রেণির মানুষ এর অপব্যবহার করছে এবং বেশি আয়ের লোকজন কিনছে। এ তিনটি যুক্তির কোনোটিই আমাদের কাছে জোরালো মনে হয়নি। কোনোটিই অর্থনৈতিক দিক থেকে ঠিক নয়। আমি বলব, সামাজিক যৌক্তিকতা- মানুষের প্রতি সরকারের যে দায়িত্ব, এর সঙ্গে এটি যায় না।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তাদের ভাষ্য- তারা সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর নির্ভর করত এবং এটি মোটামুটি নিরাপদ আয়। এখন আয়টা কমে যাবে। বিশেষ করে কোভিডের সময় যখন এর ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে, তখন আয় কমে যাওয়া হতাশাজনক।

সরকারের সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাবগুলো বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, সঞ্চয়পত্র থেকে আয় কমে যাওয়ায় নির্দিষ্ট আয়ের লোকদের কষ্ট বেড়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, সঞ্চয়ে নিরুৎসাহ হবে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আমাদের জাতীয় সঞ্চয় হার জিডিপির ৩০-৩১ শতাংশের মতো। আমাদের বিনিয়োগের হারও ৩০ শতাংশের মতো। তাই জাতীয় সঞ্চয় যদি বাড়ে- তা হলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়বে, বিনিয়োগও বাড়বে। আমাদের বিনিয়োগ ন্যূনতম ৩৪-৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। আমরা যদি বড় উন্নয়নকাজ করতে চাই, তা হলে সঞ্চয়টা কাজে লাগবে। এই তুলনায় সরকারের সুদ পরিশোধ বাবদ খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি বিশাল কিছু নয়। এমনিতে সরকারের বহু প্রকল্প আছে, নানা রকম খরচ আছে। এসব দিকে কোনো খেয়াল নেই। অনেক লোককে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি পাওয়ার প্লান্টসহ অনেক স্থানে বিরাট বিরাট প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। সব প্রজেক্ট থেকে ঠিকঠাক রিটার্ন কি আসে?

বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাভারেজ কম। এ ক্ষেত্রে মাত্র জিডিপির ২ শতাংশ খরচ হয়। এর মধ্যে সরকারি চাকুরেদের পেনশন আছে। তবে যারা বেসরকারি খাতে কাজ করেন, যারা শ্রমিক-কর্মচারী- তাদের কোনো পেনশন নেই। তাদের অবসরে যাওয়ার পর কিংবা কাজে থাকলেও তাদের কাছে যে সঞ্চয়টুকু আছে, এর বাইরে কিছুই থাকে না। তাই সঞ্চয়পত্রকে আমি বলি এক অর্থে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীরই একটি অংশ। এটিকে কমিয়ে দেওয়া নিরুৎসাহ করা বা বন্ধ করা মানে সামাজিক নিরাপত্তা কমিয়ে আনা। এমনিতে সার্বিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে ১৪০টি প্রকল্প আছে এবং ২২টি সরকারি সংস্থা কাজ করে। এর মধ্যে বেশিরভাগ সুবিধা যায় সচ্ছল লোকদের কাছে। স্থানীয় প্রভাবশালী লোকদের মাধ্যমে এ খরচটা হয়। সঞ্চয়পত্রের সুবিধা হচ্ছে সীমিত আয়ের লোকদের কাছে এটি একটি ভালো মাধ্যম।

আরেকটা জিনিস লক্ষণীয় যে, সরকারের অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক ঋণ আছে। তা এখনো জিডিপির ৩২ বা ৩১ শতাংশের বেশি নয়। ভারতে এটি ৫০ শতাংশের কাছাকাছি, এমনকি সিঙ্গাপুরের মতো একটি দেশে শতভাগের বেশি। অনেক উন্নত দেশেও এটি ১০০ শতাংশের মতো। তারা তো এ রকমভাবে ঋণ নিয়ে দেশ চালাচ্ছে। তারা কীভাবে চালাচ্ছে বা খরচ বহন করছে? মোদ্দা কথা- ঋণ ব্যবহার ভালো হলে, দুর্নীতি না হলে, অপচয় না হলে ঋণের বোঝাটা বেশি মনে হবে না। কারণ লোকজন ও দেশের অর্থনীতি এসব প্রকল্প থেকে নানাভাবে উপকৃত হয়। আবার সাধারণ মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের খরচগুলো বহন করে। সেটি ট্যাক্স, ভ্যাট বা অন্যান্য উপায়ে। তাই তাদের বঞ্চিত করা অর্থনৈতিকভাবেও যুক্তিযুক্ত নয়। শুধু একটা গাণিতিক হিসাব দিয়ে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা মোটেও ঠিক নয়।

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button