অনিয়ম করতে না পেরে কাজ ফেলে পালানোর অভিযোগ

সব প্রকল্পে পুনঃদরপত্রের সিদ্ধান্ত

চট্টগ্রাম শহরের উন্নয়নে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ২৪ প্যাকেজে ৫৮৫ কোটি টাকার কাজের উদ্যোগ নেয়। প্রতিযোগিতামূলকভাবে কার্যাদেশ নেওয়ার পর জাইকার বেঁধে দেওয়া গুণগত মান ঠিক রাখতে না পেরে সব ঠিকাদার পিছটান দিয়েছেন। ফলে সব প্রকল্পেরই কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে দরপত্র দিচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। ইতোমধ্যে ২১০ কোটি টাকার আটটি কাজের পুনঃদরপত্র দেওয়ার কাজও শেষ করেছে তদারকি প্রতিষ্ঠান চসিক।

রানা বিল্ডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ২০১৭ সালে তিনটি প্যাকেজে ১৪০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছিলেন কুমিল্লার জাকির হোসেন। তিনি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান। কুমিল্লাকেন্দ্রিক একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক থাকার কারণে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বারবার চাপ দিয়েও তার কাছ থেকে কাজ আদায় করতে পারেননি বলে অভিযোগ আছে। নিজ মেয়াদে কাজ শেষ করতে না পারায় সে সময় সমালোচিতও হয়েছিলেন আ জ ম নাছির। তার তিনটি কাজই বাতিল করা হয়েছে।

জাকির হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, যেই দামে কাজ করেছিলাম, বাস্তবে দেখলাম ওই দামে কাজ করা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে আমার অন্তত ২০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়ে গেছে। অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে গেলে আরও ৮ কোটি টাকা পকেট থেকে যেত। এখন সিটি করপোরেশন ও জাইকা আমাকে যত জরিমানা করবে করুক। আমার আপত্তি নেই। তিনি আরও বলেন, আমার তিন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৪০ কোটি টাকা।

এর বাইরে ইয়াকুব, ম্যাক ও অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৪২ কোটি টাকার জাইকার আরেকটি কাজ করেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল আলম। সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের মেয়াদ শেষে চসিকের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনের ছয় মাসের মেয়াদেও কাজটি শেষ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শেষ না হওয়ায় সেই কার্যাদেশও বাতিল করা হয়।

মঞ্জুরুল আলম বলেন, আমার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে পরে। আগের অন্য লটে ঠিকাদাররা যেভাবে বাড়তি সময় পেয়েছিলেন, আমাকে সেভাবে সময় বাড়ানো হয়নি।

উপরোক্ত চারটি প্রকল্পের মধ্যে তিনটিই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পোর্ট কানেকটিং সড়ক সংস্কারের। সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ গত চার বছরেও শেষ না হওয়ায় দেশের আমদানি ও রপ্তানিকারকরা সীমাহীন দুর্ভোগে আছেন। দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় লোকজনও।

চসিকের সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন আমাদের সময়কে বলেন, পোর্ট কানেকটিং রোডের কাজগুলো সময়মতো শেষ করার জন্য আমি বারবার ঠিকাদারকে তাগাদা দিয়েছি। সমস্যা হলো, জাইকার প্রকল্পের জন্য নিয়ম অনুযায়ী আমরা ঠিকাদার বাছাই কিংবা কার্যাদেশ দিইনি। ঠিকাদার বাছাই করেছে জাইকা। চসিকের ভূমিকা ছিল কেবলই কাজ তত্ত্বাবধানের। ফলে জাইকার কাজ আদায়ের জন্য চসিক চাইলেও ঠিকাদারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে না।

প্রকল্প পরিচালক চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাদ’ত মোহাম্মদ তৈয়ব আমাদের সময়কে বলেন, তিনটি প্রকল্পই নতুন করে দরপত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি কাজ পাচ্ছে তাহের ব্রাদার্স। অন্যটি কাশেম কনস্ট্রাকশন। দুটিই ভালো প্রতিষ্ঠান। আশা করছি নভেম্বরের মধ্যেই কাজ ঠিকমতো শেষ হবে।

এ ছাড়া নগরীর ১৮, ২৩, ২৭ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের মূল সড়ক সংস্কারের প্রায় ৭০ কোটি টাকার কাজও ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। শাকিল আহমেদ নামের এক ঠিকাদার এ কাজগুলো করার কথা থাকলেও চসিক সূত্র জানায়, তিনি শুরুতে ফুটপাত থেকে কিছু ইট তুলে বিক্রি করেন। কিছু প্যাঁচওয়ার্ক করেন। এর পর আর কাজ করেননি। শাকিল আহমদকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

প্রকল্প পরিচালক আবু সাদ’ত তৈয়ব বলেন, জাইকার অবশিষ্ট ৩৭৫ কোটি টাকার কাজেরও পুনঃদরপত্রের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিয়মমাফিক প্রতিযোগিতায় টিকেই জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) উন্নয়ন কাজগুলো পান সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। কিন্তু পরে এসব প্রকল্পে অনিয়ম করার সুযোগ না পেয়ে কাজ শেষ না করেই ঠিকাদাররা চলে গেছেন বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন।

নিজেরা সুযোগ না পেয়ে মাঝপথে কাজ ফেলে যাওয়ায় বদনামের ভাগিদার হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। চসিকের একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন হওয়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) কাজে নানা পর্যায়ে কিছুটা ছাড় পাওয়া যায়। চসিকের প্রকৌশলীরাও অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের প্রতি কাজের ছাড়ের ব্যাপারে সুদৃষ্টি দেন। কিন্তু জাইকা উন্নয়ন কাজে সে ধরনের আনুকূল্য দেখানোর সুযোগ নেই। তিন স্তরে পরীক্ষা নীরিক্ষা শেষে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা হয়। কাজের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ পরীক্ষাই হয় বুয়েটে।

চসিকের একজন প্রকৌশলী বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ঠিকাদারদের লক্ষ্যই থাকে কম কাজ করে বিল নিয়ে যাওয়া। মেয়রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় এডিপির কাজে তারা সেটা করিয়েও নেন। কিন্তু জাইকার কাজে রাজনীতির কোনো প্রভাব খাটানো যায়নি।

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক আমাদের সময়কে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পাওয়ার পর কাজ আংশিক করে বা পুরোপুরি না করে চলে গেছে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামীতে তারা আর চসিকে কোনো কাজ করতে পারবে না।

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button