সাততলা বস্তি কেন পোড়ে বারবার

সব হারিয়ে পথে বসেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি জায়গায় গড়ে তোলা বস্তিতে প্রায়ই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকা-। কেবল একটি-দুটি নয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত মহাখালীর সাততলা টেমুর বস্তিসহ সারাদেশে আগুনে পুড়েছে গরিবের নয়টি বড় আবাসস্থল। সহায়সম্বলের সঙ্গে সেই আগুন কেড়ে নিয়েছে চার হতদরিদ্রের প্রাণ; দগ্ধ ও আহতের সংখাও কুড়ির অধিক। সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই হয়েছে অধিকাংশ হতভাগার।

মহাখালীর সাততলা বস্তিতেই সাড়ে ছয় মাসের মধ্যে দুবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেল। এর আগে ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এবং ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর বস্তিটিতে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এর ফলে সহায়সম্বল হারিয়েছেন লাখো মানুষ। তবে বারবার আগুন লাগার কারণ সবারই অজানা। ক্ষতিগ্রস্ত সাততলা বস্তিজুড়ে প্রায় দুই হাজার কাঠ ও টিনশেড ঘর। সর্বশেষ গত সোমবারের ভয়াবহ আগুনে এর অর্ধেকই ভস্মীভূত হয়েছে। পুড়ে ছাই হয়েছে ঘরে থাকা আসবাবপত্র, শিক্ষার্থীদের বই-পুস্তকসহ সব কিছুই। সংসারের সব হারিয়ে শত শত মানুষ এখন পথে বসেছেন। সরকারসহ সবার সহযোগিতা চেয়েছেন হতদরিদ্র অসহায় মানুষগুলো। আবার ঘুরে দাঁড়াতে নিঃস্ব হাতেই কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছেন নতুন ঠিকানা।

ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি- অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগের দুর্বল তারের কারণে শর্টসার্কিট অথবা অবৈধ গ্যাস সংযোগের লিকেজ থেকে আগুন লাগছে বারবার। তবে বস্তিতে সেই ঝুঁকি রয়ে গেছে এখনো। আবার জায়গা

দখল নিতেও পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগায় দুর্বৃত্তরা। প্রতিটি ঘটনার পরই গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি; কিন্তু তদন্তে বস্তিবাসীর অভিযোগের (নাশকতা) সত্যতা পান না তদন্তসংশ্লিষ্টরা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- সাততলা বস্তিতে কেন বারবার আগুন লাগে? এগুলো দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা?

ফায়ার সার্ভিস ও বস্তিবিষয়ক গবেষকরা অবশ্য বলছেন- অবৈধভাবে টানা গ্যাস-বিদ্যুতের অনিরাপদ ব্যবহার, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও অসতর্কতাসহ বিভিন্ন কারণে অগ্নিকা- বেশি ঘটছে। অধিকাংশ ঘটনায় আগুনের সূত্রপাত চোরাই গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন থেকে। একটু সচেতনতা আর গ্যাস-বিদ্যুৎ লাইনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বস্তির অগ্নিকা- কমাতে পারে। আবার দখলের জন্য আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা। তবে শক্ত প্রমাণের অভাবে বস্তিবাসীর সেই অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে অসম্ভব হয়ে ওঠে বলেও অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

মা-বাবা ও দুই ভাইবোনের সঙ্গে সাততলা বস্তির একটি ঘরে থাকত আমতলী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমা আক্তার স্মৃতি। গত রবিবার পড়া শেষে স্কুলের বইগুলো যত্ন করে গুছিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে সে। সোমবার ভোর ৪টার দিকে আগুনের লেলিহান শিখা প্রথম নজরে আসে স্মৃতির বাবা শহীদুল ইসলামের। তিনি পেশায় হকার। ঘুমিয়ে থাকা মেয়েকে জাগিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। চিৎকার করে ডেকে তোলেন বস্তিবাসীকে। চারদিকে শুরু হয়ে যায় হাহাকার, হৈচৈ আর আহাজারি। চোখের সামনে ঘর পুড়তে দেখছিল হতদরিদ্র পরিবারগুলো। হঠাৎ স্মৃতির মনে পড়ে তার প্রিয় বইয়ের কথা। সেগুলো উদ্ধারে এগিয়েও যায় শিশুটি; কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও জ্বলন্ত আগুনের ভেতর থেকে বই-খাতা উদ্ধার করা আর সম্ভব হয়নি। বইয়ের সঙ্গে পুড়ে গেছে তাদের স্বপ্নগুলোও।

সেই স্মৃতিকে গতকাল নতুন পাঠ্যবই উপহার দেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় মহাখালীর আইপিএইস স্কুল অ্যান্ড কলেজে অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা অনুষ্ঠানে বই হাতে পেয়ে অশ্রুশিক্ত স্মৃতি বলে, ‘নতুন বই পেয়ে আমি অনেক খুশি। এখন আবার ভালো করে পড়ালেখা শুরু করব।’ ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী কেউই অভুক্ত থাকবে না জানিয়ে অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি মেয়র বলেন, ‘স্মৃতির মতো আরও অনেকের বইও পুড়ে গেছে সেদিনের আগুনে। তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদেরও বই দেওয়া হবে।’

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button