বেঙ্গল স্ট্রেইনে আতঙ্ক

গত কয়েক দিন দেশে করোনা শনাক্তের হার কমেছে। কমেছে মৃত্যুও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা দুই সপ্তাহ সর্বাত্মক লকডাউনের কারণে রোগী শনাক্তের হারও কমেছে। তবে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শনাক্ত হওয়া ট্রিপল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্ট বা বেঙ্গল স্ট্রেইন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের সীমান্ত লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের এ ভ্যারিয়েন্ট খুবই সংক্রমক। বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হতে পারে। এর জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বাংলাদেশকে।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন জনস্বাস্থ্যবিদরা। নতুন এ ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ঠেকাতে জোরদার গবেষণার তাগিদ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধেরও পরামর্শ দিয়েছেন। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে ভারত থেকে আগমন-প্রস্থান সব ফ্লাইট বাতিল করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। এমনকি রেডলিস্টে ফেলেছে ভারতকে।

বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলবন্দর খোলা। চালু রয়েছে বিশেষ ফ্লাইট। প্রতিদিনই শত শত মানুষ ভারত থেকে দেশে ফিরছেন। ভারতে যাচ্ছেনও। অথচ করোনার নতুন ধরন থেকে রক্ষায় শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আন্তঃরাজ্য সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে উড়িশ্যা রাজ্য সরকার। পশ্চিমবঙ্গে করোনার ‘ট্রিপল মিউটেন্ট’ পাওয়ার পরই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্যটি। একই সঙ্গে বালাসোর ও ময়ূরভঞ্জ জেলা দিয়ে আন্তঃরাজ্য সীমান্তের তিনটি প্রধান চেকপোস্টেও কঠোর পুলিশি নজরদারি শুরু করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, চেকপয়েন্ট দিয়ে যারা উড়িশ্যায় প্রবেশ করছেন, তাদের সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা আগে আরটি-পিসিআর ল্যাবে করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তাতে নেগেটিভ এসেছে- এমন রিপোর্ট দেখাতে বলা হচ্ছে। এ ছাড়া করোনা টিকাগ্রহণের সনদ দিতে পারলেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রাজ্যে প্রবেশের পরে তাদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতেও বলা হচ্ছে। অথচ এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশ এখনো নিইনি।

জানা গেছে, পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে কোভিড ১৯-এর ইউকে ভ্যারিয়েন্ট ও ডাবল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্ট (ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট) একযোগে সংক্রমণ হচ্ছে। তরুণ, কিশোর, শিশু- সব বয়সী মানুষ ভয়াবহ কোভিড-১৯ সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ট্রিপল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্ট (ই.১.৬১৮)। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই ভ্যারিয়েন্ট খুব সংক্রমকÑ এমনকি মারাত্মকও হতে পারে। নতুন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। এ কারণে ভ্যারিয়েন্টটির নাম বেঙ্গল স্ট্রেইন।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কোভিডের যে নতুন ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে তা নিয়ে এখন গবেষণা করতে হবে। যে ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে তা বাংলাদেশে কী পরিমাণ আসছে। একই সঙ্গে করোনা মোকাবিলায় যে টিকাদান কর্মসূচি চলছে তা নতুন ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে কাজ করছে কিনা তা নিয়ে গবেষণা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কোভিডের সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে এবং টিকা নিতে হবে। কোভিডের নতুন ভ্যারিয়েন্টের প্রবেশ ঠেকাতে ভারতের সঙ্গে সড়ক, রেল ও এয়ারসহ সব যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে। ভারত থেকে কেউ বাংলাদেশে আসতে পারবে না, যেতেও পারবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে ইউকে ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট কমবেশি পাওয়া গেছে। এখন ভারতে ডাবল ও ট্রিপল ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। ভারত বাংলাদেশের পাশর্^বর্তী দেশ হওয়ায় নতুন ভ্যারিয়েন্ট আসবেই। এর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে সুসংগঠিত ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে পর্যবেক্ষণ, ভারতে নতুন ভ্যারিয়েন্ট কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সংক্রমণ আরও বাড়ায় কিনা তা পর্যবেক্ষণ করাও অত্যাবশ্যক। অপরটি হচ্ছে ভারতের সঙ্গে আমাদের সড়ক, রেল, এয়ার ও নৌসহ সকল যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ এবং লোক চলাচল সীমিত করা। যারা আসবেন তাদের দুই ডোজ টিকা নিয়ে আসছে কিনা এবং কোয়ারেন্টিনও নিশ্চিত করা। বেশি লোক এলে বেশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে গত ৪ এপ্রিল থেকে চলমান লকডাউনে দেশে সংক্রমণ যে কমতির দিকে যাচ্ছে তার কার্যকারিতা কমে যাবে। দেশে সংক্রমণ আবার বেড়ে যেতে পারে।

ভারতের ট্রিপল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্ট (ই.১.৬১৮) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ অনেকেই লেখালেখি করছেন। গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা সামাজিকমাধ্যমে লিখেছেন, ভারতে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইউকে ভ্যারিয়েন্ট ও ডাবল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্ট (ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট) একযোগে চালাচ্ছে এ ধ্বংসযজ্ঞ। তরুণ, কিশোর, শিশু কেউ বাদ পড়ছে না মারাত্মক কোভিড-১৯ সংক্রমণের হাত থেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি দুঃসংবাদ। ট্রিপল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্টের (ই.১.৬১৮) আবির্ভাব ঘটেছে। আমাদের জন্য উদ্বেগজনক যে, নতুন ভ্যারিয়েন্টটির উৎস পশ্চিমবঙ্গ। ১৩০ জিনোম সিকুয়েন্সিং করে ১২৯টি পাওয়া গেছে পশ্চিমবঙ্গে। ইতোমধ্যে সারা বিশ্ব ভারতকে রেড লিস্টে রেখেছে। অর্থাৎ এই সংকটকালে সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ভারত থেকে আগমন-প্রস্থান সকল ফ্লাইট বাতিল করেছে। বাংলাদেশেরও উচিত এ ধরনের পদক্ষেপ অবিলম্বে অবলম্বন করা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন বলেছেন, সীমান্ত বন্ধ হলেও কোনো কূটনৈতিক সমস্যা হবে না। তার দাবি, ভারত তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের তরফ থেকে কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা করলেও তাদের সমস্যা হবে না। আমরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেছি। কয়েক দিন আগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ছিল। সেখানে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলাম। এখন কোনো বিমান যাতায়াত করছে না। কিন্তু স্থল ও নদীপথ উন্মুক্ত আছে। বেনাপোল দিয়ে লোকজন আসা-যাওয়া করছে। বৈঠকে আমরা বলেছিলাম- ভারতে কোভিডের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। কয়েক দিন আগে ভারত থেকে বেনাপোল সীমান্ত অতিক্রম করা ১৯ বাংলাদেশির একটি দলের মধ্যে ১৭ জনই কোভিডে আক্রান্ত পাওয়া গেছে। এরা সবাই চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। তারা পজিটিভ হয়ে আসছেন।

আমরা প্রস্তাব করেছিলাম- এ মুহূর্তে আমরা কোনো লোককে ভারত থেকে আসতে দেব না। সীমান্ত বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলাম। যেভাবে ভারত আমাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। বৈঠকে উপস্থিত অনেকে তখন বলেছেন, ভারতীয়দের আসতে নিষেধ করা সম্ভব; কিন্তু বাংলাদেশিদের কীভাবে আসতে নিষেধ করা হবে? সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সীমান্ত বন্ধ করতে পারে।

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button