মামুনুল হক গ্রেপ্তার চাপে হেফাজত

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার বেলা ১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ দেখান মামুনুল হক সমর্থক ছাত্র-শিক্ষকরা। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের রিসোর্টকা-ের পর মামুনুল হককে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে অস্বস্তি শুরু হয়। ওই ঘটনার কয়েকদিন পরই হেফাজত ইস্যুতে সরকার ধাপে ধাপে কঠোর হয়ে ওঠে। সংগঠনটির নেতাদের গ্রেপ্তারে শুরু হয় বিশেষ অভিযান। ঢাকা মহানগর সভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবসহ অন্তত আটজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আসাকে ঘিরে নিজেদের শক্তি দেখালেও এখন বেশ আতঙ্কেই হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। গতকাল মামুনুল হক গ্রেপ্তারের ফলে ধর্মীয় এই সংগঠনটি কঠিন চাপে পড়েছে বলেই মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেছেন, হেফাজতের যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। ধাপে ধাপে এই অভিযানের গতি বাড়ানো হবে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এরই অংশ হিসেবে হেফাজতের অর্ধশতাধিক নেতার গতিবিধির ওপর নজর রাখছে পুলিশ।

মামুনুল হককে গতকাল গ্রেপ্তারের পর মোহাম্মদপুর কলেজ রোডের তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তেজগাঁও থানা। এ বিষয়ে নিজ কার্যালয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০২০ সালে মোহাম্মদপুর থানায় একটি নাশকতা মামলা হয়। মামলা তদন্তে ওই ঘটনায় সুস্পষ্ট সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েই তাকে (মামুনুল হক) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া হেফাজতের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা, থানায় হামলা, ভাঙচুরসহ অনেক মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত চলছে।’

হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাকে (মামুনুল হক) নজরদারিতে রেখেছিলাম। গ্রেপ্তারের পর তেজগাঁও থানা কমপ্লেক্সে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হামলায় জড়িত থাকার কথা এবং তিন বিয়ের কথা স্বীকার করছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রথম বিয়ের পর যে দুই নারীর কথা আলোচনায় এসেছে তারা দু’জনই তার স্ত্রী। এসব বিয়ে তিনি সামাজিকভাবে গোপন রেখেছেন। মোহাম্মদপুর থানার মামলায় সোমবার (আজ) মামনুলকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে।

উপকমিশনার বলেন, ‘মোহাম্মদপুর থানার মামলা ছাড়াও মো. শাহজাহান নামের একজন গাজীপুরে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডিতে শাহজাহান বলেছেন- মামুনুল হকের সঙ্গে বিয়ের পর তার বোনকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে বিষয়েও আদালতের অনুমতিসাপেক্ষ তদন্ত করা হবে।’

গত বছরের নভেম্বরে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে আলোচনায় আসেন মামুনুল হক। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ডিসেম্বরে কুষ্টিয়া শহরে বঙ্গবন্ধুর একটি নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। ভাস্কর্য বিরোধিতা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরী ও যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। এর মধ্যে আবার গত মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তা-ব চালায় হেফাজত। সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় সংঘাত-নাশকতার ঘটনায় মামুনুল হকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁওয়ের একটি রিসোর্টে গত ৩ এপ্রিল এক নারীসহ অবরুদ্ধ হয়ে আবারও আলোচনায় আসেন মামুনুল হক। যদিও ওই নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন হেফাজতের এই নেতা।

দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের ভয়াবহ তা-ব ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান নিয়েও উঠে নানা প্রশ্ন। বিশিষ্ট নাগরিকদের সমালোচনায় বিদ্ধ হয় সরকার। এর পরই হেফাজত ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত সংগঠনটির অন্তত আটজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে গত শনিবার রাতে বারিধারা মাদ্রাসা থেকে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। একই দিন দুপুরে গ্রেপ্তার হন কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ। এর আগে ১৬ এপ্রিল বিকালে লালবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় হেফাজত নেতা জুবায়ের আহমেদকে। ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় লালবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা সাখাওয়াত হোসেন। ১৩ এপ্রিল রাতে যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কেন্দ্রীয় কমিটির সহপ্রচার সম্পাদক মুফতি শরিফউল্লাহ্কে। গত ১১ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে গ্রেপ্তার করা হয় চট্টগ্রাম থেকে। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরকা-ে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এদিকে মামুনুল হকের গ্রেপ্তার ঘিরে কেউ যাতে নাশকতামূলক কর্মকা- চালাতে না পারে, তাই রাজধানীসহ সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। বিশেষ করে রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামসহ হেফাজত অধ্যুষিত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন থানা ছাড়াও মসজিদ, মাদ্রাসা ও পাড়া-মহল্লাতেও জোরদার করা হয়েছে পুলিশি নিরাপত্তা। এমনকি মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের আগে মোহাম্মদপুরে দুই শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা যায়, গতকাল রবিবার সকালেই সব এসপি ও রেঞ্জের ডিআইজিকে স্ব স্ব জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়। কেউ যাতে কোনোভাবেই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, মানুষ ও সম্পদের ক্ষতি না করতে পারে; সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে।

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button