সিন্ডিকেট থাকলে ফের বন্ধ হবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিতর্কিত ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসের (এফডব্লিউসিএমএস) সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় না দিয়ে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য বাজার উন্মুক্তের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বায়রা সিন্ডিকেট নির্মূল ঐক্যজোট। মানববন্ধনে নেতারা দাবি করেছেন, বৈধ সব রিক্রুটিং এজেন্সি সরকারের সব বিধিবিধান পালন করে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হোক। অন্যথায় বাজার কুক্ষিগত হবে। ফলে দেশটির শ্রমবাজার আবার বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গতকাল সোমবার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে মানববন্ধনে সংগঠনের নেতারা এ দাবি জানান। মানববন্ধন শেষে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। মন্ত্রীর পক্ষে তার একান্ত সচিব স্মারকলিপি গ্রহণ করেন।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন দেশের জনশক্তি রপ্তানিকারক মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক সভাপতি আবুল বাসার, সাবেক অর্থ সচিব ফখরুল ইসলাম, রিক্রুটিং এজেন্সি ঐক্যপরিষদের মহাসচিব আরিফুর রহমান, বায়রা গণতান্ত্রিক ঐক্যফ্রন্টের সভাপতি মুজিবুর রহমান মজিব, বায়রা সিন্ডিকেট নির্মূল ঐক্যজোটের সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত হোসেন।

লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বায়রা সিন্ডিকেট নির্মূল ঐক্যজোটের সদস্য সচিব টিপু সুলতান। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে গণতান্ত্রিক পরিবেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি যেখানে মানুষের জীবনমানের সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে, সেখানে সিন্ডিকেট নামক অভিশাপ থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছি না। সিন্ডিকেটের ফলে কর্মীদের বিড়ম্বনা, সিন্ডিকেটধারী ব্যবসায়ীদের অব্যবস্থাপনায় দেশ ও আন্তর্জাতিকবাজারেও কলঙ্কের তিলকচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছি।

এমনকি আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট হিউম্যান ট্রাফিকিংয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দাতশ্রী আমিনের প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেটের অনলাইন সিস্টেম এফডব্লিউসিএমএসের মাধ্যমে দেশের গরিব মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

১৬ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে শ্রমবাজারসংক্রান্ত ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং মিটিং’ হবে। আমরা জয়েন্ট ওয়ার্কিং মিটিংকে সাধুবাদ জানাই। তবে অতিসত্বর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিকর্মীদের জন্য উন্মুক্ত করা হোক- এটিই আমাদের কাম্য। আমরা বিশ্বাস করতে চাই মন্ত্রণালয় যেমন কর্মীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে, তেমনি এ খাতে যারা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বৈধভাবে কাজ করি তাদের স্বার্থও সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে কতটি রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাবে সে এজেন্ডা রয়েছে। আমরা মনে করি কতটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও কোন বিবেচনায় এজেন্সি সিলেকশন হবে, সেটি একান্তই বাংলাদেশ সরকারের ব্যাপার। আমরা দাবি করি, সরকারের বৈধ সব রিক্রুটিং এজেন্সি সরকারের সব বিধিবিধান পালন করে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হোক। তা না হলে বাজার কুক্ষিগত করার কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমরা চাই বাজারটি দীর্ঘমেয়াদি চালু থাকুক। তারা আরও বলেন, গুটিকয়েক এজেন্সি নিয়ে সিন্ডিকেট গঠনের সিদ্ধান্ত হবে এই সেক্টরের বিপক্ষে, রিক্রুটিং এজেন্সির বিপক্ষে শ্রমিকের স্বার্থের বিপক্ষে এবং দেশের সুনামের বিপক্ষে। যেখানে নেপাল ১৬০০ রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়ে সম্মিলিতভাবে স্বল্প খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর মডেল স্থাপন করেছে, সেখানে আমাদের এক হাজার ২০০ এজেন্সিকে কেন বঞ্চিত করা হবে? আমরা চাই নেপালকে অনুসরণ করে দেশের সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হোক।

সংগঠনের নেতারা আরও বলেন, এজেন্ডাতে এফডব্লিউসিএমএস অনলাইন সিস্টেমের ব্যাপারে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। মালয়েশিয়ার বেস্টিনেট কোম্পানি অনলাইন এফডব্লিউসিএমএস একটি মেয়াদোত্তীর্ণ, বাতিল, বিতর্কিত, আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত ও দুর্নীতিতে অভিযুক্ত। এর হোতা গতবারের সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড এবং মাহাথির সরকারের কালো তালিকাভুক্ত এসপিপিএ ও বেস্টিনেটের মালিকানাধীন দাতো শ্রী আমিন। এই এফডব্লিউসিএমএস-কে ব্যবহার করে দাতো শ্রী আমিন বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, যা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয়েছে।

ওই সিস্টেম শুধু অনলাইন সার্ভিস প্রোভাইড করার কথা থাকলেও তারা ভিসা ট্রেডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়ান সরকার বেস্টিনেটের সিস্টেম বাতিল করে এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকের বাজার বন্ধ হয়ে যায়। এই এফডব্লিউসিএমএস হলো এসপিপিএর একটি অংশ, যা দিয়ে কাজের ডিমান্ড, কলিং ভিসা এবং মেডিক্যাল সেন্টারগুলোকে অর্থ আদায়ের জন্য জিম্মি করে রাখত। তারা আরও বলেন, এফডব্লিউসিএমএস যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতো, তা হলে কখনই ২৫-৩০ বা সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং লাইসেন্সকে নিয়ে কাজ করার অপচেষ্টা করত না। কেননা একটির স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ সিস্টেম হাজার হাজার লাইসেন্স নিয়ে কাজ করতে পারে। এর অসংখ্য উদাহরণ বিশ্বব্যাপী রয়েছে। দাতো শ্রী আমিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এফডব্লিউসিএমএস-কে তার ব্যবসায়িক স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করে। এর সফটওয়্যারের সব কোডিং ও প্রোগ্রামিং তারই সৃষ্টি এবং নিয়ন্ত্রণে। গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি সে অটোমেটেড সিস্টেমের আড়ালে ম্যানুয়ালি কারসাজির মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। যার কারণে বরাবরই এই এফডব্লিউসিএমএস দিয়েই শ্রমিকের অর্থ লোপাটে সীমিতসংখ্যক লাইসেন্স নিয়ে কাজ করার কথা বলে। কেননা যদি সব রিক্রুটিং লাইসেন্স কাজ করার সুযোগ পায় তা হলে প্রতিযোগিতামূলকভাবেই অভিবাসন ব্যয় কমে যাবে এবং তার সিস্টেমের নামে জিম্মি করে অর্থ লোপাটের অসৎ উদ্দেশ্য সফল হবে না। যার উদাহরণ নেপাল। এফডব্লিউসিএমএস-ই এই সেক্টরে সিন্ডিকেটের জনক। এটি একটি ব্যর্থ সিস্টেম, যার কারণে গতবার দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। এফডব্লিউসিএমএস সিস্টেমের কৌশলে এবং দাতো শ্রী আমিনের কারসাজিতে উচ্চ অভিবাসন ব্যয় গুনতে হয়েছে শ্রমিকদের। এমনকি মালয়েশিয়ার অনেক নিয়োগকর্তা বিনা খরচে শ্রমিক নিতে চেয়ে এফডব্লিউসিএমএস সিস্টেমের কারসাজির কারণে তা সম্ভব হয়নি।

অথচ শূন্য খরচে অভিবাসনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দাতো শ্রী আমিনের বেস্টিনেট কোম্পানির এফডব্লিউসিএমএস আর এসপিপিএর যাত্রা শুরু করে। কিন্তু পরে এফডব্লিউসিএমএস ও এসপিপিএর ফাঁদে ফেলে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা খুইয়ে বিদেশ যেতে হয়েছিল অসহায় শ্রমিকদের। সুতরাং ওই একই ব্যক্তির একই সিস্টেমকে কোনোভাবেই আর বিশ্বাস করা যায় না। এই কালো তালিকাভুক্ত বেস্টিনেট, দাতো শ্রী আমিন এবং এফডব্লিউসিএমএসের দুর্নীতির বিষয় হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। মালয়েশিয়ায় অভিবাসন সেক্টরে কোনো প্রকার সিন্ডিকেট করা যাবে না এই মর্মে আপিল বিভাগ রায়ও দেন।

সিন্ডিকেটের বিকল্প প্রস্তাব দেয় সংগঠানটি। প্রস্তাবনায় বলা হয়- ডেটা ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মী প্রেরণ। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডেটা ব্যাংককে যুগোপযোগী করলে সব রিক্রুটিং এজেন্সি মধ্যসত্তা বাদ দিয়ে সরাসরি ডেটা ব্যাংক থেকে লোক নিয়োগ করলে কম খরচে মালয়েশিয়া কর্মী পাঠানো সম্ভব। মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালের মতো এমওইউ সাইন করা গেলে নেপালের মতোই কম খরচে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো যাবে বলে আমরা দৃঢ় বিশ্বাস করি।

প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, যেখানে দুই দেশেই বিকল্প ও আরও যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক আইটি কোম্পানি এবং সিস্টেম প্রোভাইডার রয়েছে। তা সত্ত্বেও কেন বারবার বিতর্কিত অস্বচ্ছ ও নিন্দিত এ এফডব্লিউসিএমএসের অপতৎপরতা চলছে। যেখানে আরও বেশ কয়েকটি অধিক সক্ষমতাসম্পন্ন সিস্টেম প্রোভাইডার কোম্পানি এই সেবা দিতে আগ্রহী, সেখানে কেন আমরা বিতর্কিত এই সিস্টেমকে বিবেচনায় এনে ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাচ্ছি। এফডব্লিউসিএমএস বাদ দিয়ে অন্য যে কোনো স্বচ্ছ সিস্টেম এলে আমাদের আপত্তি নেই। এফডব্লিউসিএমএস-কে মেনে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি করা মানে তাদের অতীতের সব অবৈধ কাজের বৈধতা দেওয়া এবং তাদের পুনরায় চুক্তি নবায়নের সুযোগ করে দেওয়া। একমাত্র বাংলাদেশ সরকারের সম্মতি পেলেই এফডব্লিউসিএমএস তাদের চুক্তি নবায়ন করতে পারবে, অন্যথায় না।

বায়রার সিন্ডিকেট নির্মূল ঐক্যজোটের পক্ষে স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন সংগঠনের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী, সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত হোসেন ও সদস্য সচিব টিপু সুলতান।

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button