বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে জটিল সমীকরণ

শতভাগ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পাসের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সমীকরণ জটিল হয়ে পড়েছে। উত্তীর্ণ প্রায় শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাবেন বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদেরও এবার ভর্তির নিশ্চয়তা নেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে।

করোনা সংক্রমণের কারণে গত বছর এইচএসসি/সমমানের পরীক্ষা হয়নি। জেএসসি-এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে গত মাসে এইচএসসির ফল প্রকাশ হয়েছে। ফলে শতভাগ শিক্ষার্থীই পাস করেছেন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার, জিপিএ-৫ থেকে ৪-এর মধ্যে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৭৪০ জন এবং জিপিএ-৩.৫ থেকে ৪-এর মধ্যে পেয়েছেন ৩ লাখ ৪ হাজার ১৪৪ জন।

তথ্যানুসারে এই ৯ লাখ ৬৫ হাজার শিক্ষার্থীই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা অর্জন করবেন। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ মিলিয়ে আসন মাত্র ৬৩ হাজারের কিছু বেশি। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হবে তীব্র প্রতিযোগিতা।

ফল প্রকাশের পর ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর পরীক্ষা নেওয়া হবে। দেশের সরকারি ৪৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২০টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ৬টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৩টি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেবে। অন্যদিকে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট এই গুচ্ছ পদ্ধতির পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। ফলে এগুলোতে যারা ভর্তি হতে চাইবেন, তাদের সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।

গুচ্ছ পদ্ধতিতে অংশ নেওয়া ২০টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, ভর্তি পরীক্ষার প্রাথমিক আবেদনে কোনো ফি নেওয়া হবে না। পরে যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচিতরা ৫০০ টাকা আবেদন ফি জমা দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মোট আসন ২৩ হাজার ১০৪টি। এখানে আবেদনকারীদের বিজ্ঞান শাখার জন্য ন্যূনতম জিপিএ-৭, বাণিজ্য শাখার জন্য ন্যূনতম জিপিএ-৬.৫ এবং মানবিক শাখার জন্য ন্যূনতম জিপিএ-৬ থাকতে হবে। শুধু এ বছরের জন্যই গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯ ও ২০২০ সালে এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। পরবর্তী বছর থেকে এ সুযোগ থাকবে না।

ভর্তি পরীক্ষার আগেই বাছাই সম্পর্কে গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি, বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়ে কীভাবে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষায় বসানো যায়। পৃথক কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি যাচাই-বাছাই করে দেখবে সর্বোচ্চ কতসংখ্যক শিক্ষার্থীর একসঙ্গে পরীক্ষা নেওয়া যায়। তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বলতে পারব কতজন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসির সদস্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর আমাদের সময়কে বলেন, যথাসম্ভব সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানাই। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এটিও মনে রাখতে হবে শতভাগ শিক্ষার্থীকে কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ দেওয়া যায় না। একটি নির্দিষ্ট স্কোরের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ সিজিপিএধারী শিক্ষার্থীদের নিয়েই ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অতীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার কারণে এবার প্রাথমিক আবেদনে ফি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যারা ভর্তি পরীক্ষায় বসার যোগ্য বিবেচিত হবেন, তারাই কেবল ফি পরিশোধ করবেন।

ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজসহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৩ লাখ ২০ হাজার আসন রয়েছে। আর এবার এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়েছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন ১৩ লাখের বেশি হলেও শিক্ষার্থীরা মূলত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে চাইবেন। এ ক্ষেত্রে আসন খুবই কম। ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন ৬০ হাজার এবং সরকারি মেডিক্যাল কলেজে তিন হাজারের সামান্য বেশি। সে হিসাবে এই ৬৩ হাজার আসনেই মূল লড়াই হবে।

এদিকে ১৩ লাখ ২০ হাজার আসনের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি কলেজেই আসন প্রায় ৯ লাখ। আর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন ৭০ হাজারেরও বেশি। কলেজগুলোতে কোনো ধরনের ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। তবে কলেজগুলো পছন্দের তালিকায় নেই অধিকাংশ শিক্ষার্থীর।

এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২ লাখ আসন রয়েছে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এতসংখ্যক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেও সেখানে তারা ভর্তির খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য। সেগুলোয় সুযোগ না পেলে অন্য কোথাও চেষ্টা করবে।

ভর্তিচ্ছু কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেশিরভাগেরই প্রথম পছন্দ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মেডিক্যাল কলেজ। আবার যারা একটু ভালো ফল করেছে তাদের পছন্দ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button