কমলাপুর স্টেশন ভাঙার যৌক্তিকতা নিয়ে ধোঁয়াশা

কমলাপুর স্টেশন একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা ইতিহাস-ঐতিহ্য। আগে ঢাকার প্রধান স্টেশন ছিল ফুলবাড়িয়ায়, যা শহরের উত্তর দক্ষিণের যোগাযোগে বাধা ছিল। ১৯৫৮ সালে স্টেশনটি কমলাপুরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মেট্রোরেল নির্মাণের কারণে কমলাপুর রেলস্টেশন ভাঙা পড়বে এমনটিই বলা হচ্ছিল। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বলছে, ঐতিহ্যবাহী কমলাপুর স্টেশন ভাঙার দরকার নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সত্যিই কি ভাঙা পড়ছে কমলাপুর? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তা হলে কেন ভাঙতে হচ্ছে, এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা। রেলের অনেকে বলছেন, মেট্রোরেলের দোহাই দিয়ে স্টেশনটি ভাঙতে চায় রেল কর্তৃপক্ষ। মূলত মাল্টিমোডাল হাব নির্মাণের স্বার্থে ভাঙার পরিকল্পনা করেছে তারা।

সূত্রমতে, রেলের দাবি- মেট্রোরেলের জন্য কমলাপুর স্টেশন ভাঙতে হবে। কমলাপুর স্টেশনের ঠিক সামনে মেট্রোরেলের স্টেশন নির্মাণ হবে। ফলে কমলাপুর স্টেশন আড়ালে পড়ে যাবে।

গত ২৪ নভেম্বর রেলভবনে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনসহ বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ যুক্তিতেই কমলাপুর স্টেশন ভেঙে উত্তরে শাহজাহানপুরের দিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব আসে। রেলওয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেছেন, মেট্রোরেলের কাজ শেষে কমলাপুর স্টেশনের স্থানান্তর করা হবে। বর্তমানে স্টেশনের নকশায় হুবহু আরেকটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে।

এর পর গত ১৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় নানন্দিক কমলাপুর রেলস্টেশন ভেঙে আরও উত্তরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্টেশন ভেঙে স্থানান্তরের প্রস্তাবের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভায় বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের এলিভেটেড কাঠামোর জন্য কমলাপুর স্টেশন যেন ঢেকে না যায় সে জন্য মূল অংশ (স্টেশন প্লাজা) উত্তর দিকে স্থানান্তর করা যেতে পারে। ঢাকা এভিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কমলাপুর স্টেশনের মধ্য দিয়ে যাবে, যা মাল্টিমোডাল হাবের পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তবে গত বৃহস্পতিবার মেট্রোরেলের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (পূর্ত) আবদুল বাকী মিয়া বলেছেন, কমলাপুর স্টেশনের মূল ভবন থেকে ৩০ মিটার দূরে মেট্রোরেলের স্টেশন হবে। কমলাপুর স্টেশনের উচ্চতা ১৮ মিটার। মেট্রোরেলের স্টেশনের উচ্চতা হবে ২২ মিটার উঁচুতে। তাই মেট্রোরেলের স্টেশনের কারণে কমলাপুর স্টেশন আড়ালে পড়ার কারণ নেই। কমলাপুর স্টেশনের সামনে যে পার্কিং রয়েছে, তাতেও মেট্রোরেলের প্রভাব পড়বে না। কমলাপুর স্টেশন ভাঙার বিষয়টি রেলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।

জানা গেছে, জাপানের সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতিতে সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) প্রকল্পগুলোর পর্যালোচনায় অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘কমলাপুর স্টেশন বিল্ডিংয়ের আগে এমআরটি ৬-এর সিজর ক্রসিংয়ের স্থান সংকুলান করার জন্য এমআরটি ৬-এর প্ল্যানে স্টেশন বিল্ডিং উত্তর দিকে স্থানান্তর করা হবে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ডিএমটিসিএল সম্মত হয়েছে’।

জাপানের অর্থায়নে পিপিপির মাধ্যমে কমলাপুর স্টেশনকে ‘মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব’-এ রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে।

প্রকল্পের নথি সূত্রে জানা গেছে, ‘মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব’ হাইস্পিড ট্রেন, মেট্রোরেল, পাতাল রেল এবং এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করবে। এখান থেকে একজন যাত্রী ঢাকাসহ দেশের যে কোনো প্রান্তে যেতে পারবেন। ‘মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব’ ঘিরে থাকবে হোটেল, বিনোদনকেন্দ্রসহ নানা বাণিজ্যিক স্থাপনা। জাপানের কাজিমা করপোরেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। একই সংস্থা বিমানবন্দর স্টেশনকেও ‘মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব’-এ রূপান্তরের দায়িত্ব পেয়েছে।

২০১৯ সালের ২১ মার্চ কাজিমা করপোরেশনের প্রকল্প ধারণাগত প্রস্তাব তৃতীয় বাংলাদেশ-জাপান পিপিপি সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) চলতি মাসে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল পথ দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তা কমলাপুর পর্যন্ত এক দশমিক ৭ কিলোমিটার বাড়ানো হচ্ছে। জাপানের সহায়তায় রাজধানীতে আরও চারটি মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে বিমানবন্দর থেকে পাতালপথে একটি মেট্রোরেল এসে কমলাপুরে মিশবে।

দুই মার্কিন স্থপতি ড্যানিয়েল বার্নহ্যাম এবং বব বুই সিডনির বিখ্যাত অপেরা হাউস এবং গ্রামবাংলার কুঁড়েঘরের মিশেলে কমলাপুর স্টেশনের নকশা করে। ১০ বছর পর ১৯৬৮ সালে চালু হয় কমলাপুর স্টেশন। ৩৬টি বর্গক্ষেত্রের সমন্বয়ে বিশাল একটি বর্গক্ষেত্র। কমলাপুর স্টেশন না ভাঙার চিন্তা থেকে সরে আসতে ইতোমধ্যে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও স্টেশন ভবনটি রক্ষার দাবি উঠেছে।

এমন আরো সংবাদ

Check Also
Close
Back to top button