হুবারা বাস্টার্ডের জন্য হন্য হয়ে পাকিস্তানে আসেন আরব বাদশাহ-যুবরাজরা

পাকিস্তানের এক পরিযায়ী পাখির জন্য পাগল আরব রাজপরিবারের সদস্যরা। ‘হুবারা বাস্টার্ড’ নামের ওই পাখি শিকারে প্রতি জানুয়ারিতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ছুটে যান বাদশাহ-যুবরাজরা। তোয়াক্কা করেন না নিরাপত্তা ঝুঁকি বা কোটি কোটি টাকা খরচের। করোনা পরিস্থিতিতেও থেমে নেই গোপন এ শিকার অভিযান।

প্রতি বছর শীতের সময়ে ‘হুবারা বাস্টার্ড’ পাখি শিকারে বেলুচিস্তানে জনমানবহীন মরুভূমি এলাকায় দেখা মেলে আরব শেখদের। বিলাসবহুল এসইউভি গাড়ির বহর নিয়ে মরুর বুকে একসাথে দাপিয়ে বেড়ায় তারা। যাত্রীদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে ‘হুবারা বাস্টার্ড’ অতিথি পাখি শিকার করা।

ধনী আবরদের কাছে পাখি শিকার অনেকটা নেশার মতো। শিকারের জন্য বাজ পাখির বিশাল বহর আছে অনেকের। কিন্তু শত মাইল দূরের দেশ পাকিস্তানে কেনো? এই প্রশ্নের উত্তরও এই পরিযায়ী পাখি। মূল আবাস মঙ্গোলিয়া ও তার প্রতিবেশী অন্যান্য দেশ। কিন্তু প্রতি শীতে পাকিস্তানে পাড়ি জমায় ‘হুবারা বাস্টার্ড’ নামের এই অতিথি পাখি। থাকে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আরব শেখদের বিশ্বাস এর মাংস আয়ু ও যৌনশক্তি বৃদ্ধি করে। তাই যত ঝুঁকি আর খরচই হোক পাখিটি শিকারে মরিয়া থাকে আরব ধনীরা।

এই শিকারে আগ্রহীদের তালিকায় সবার উপরে সৌদি, কাতার এবং আরব আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্যরা। বিলুপ্ত প্রায় বলে পাকিস্তানে ‘হুবারা বাস্টার্ড’ শিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু আরব শেখদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। প্রতিবছর বিশেষ বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজ পরিবার থেকে ২৫ থেকে ৩৫ জনকে দেওয়া হয় শিকারের লাইসেন্স। প্রতিটি লাইসেন্স বাবদ পাকিস্তান সরকার পায় এক লাখ ডলার করে।

টার্কি কিংবা বড় আকারের মুরগির মতো দেখতে এই পাখি জনবসতি থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে। এই পাখি অন্য সাধারণ পাখিদের মতো দল বেঁধে না থেকে একা থাকতে পছন্দ করে। এছাড়া ধূসর বর্ণের হওয়ায় মিশে থাকে বালুর সাথে। তাই মরুভূমিতে তাদের খুঁজে বের করা কঠিন শিকারকারীদের জন্য।

একটি ‘হুবারা বাস্টার্ড’ পাখি পেতে দিনভর হাজার কিলোমিটার ছুটতেও আপত্তি নেই আরব শেখদের। পায়ের ছাপ অনুসরণ করে পিছু নিয়ে অবস্থান নিশ্চিত হলে শিকারের চূড়ান্ত ধাপটি সম্পন্ন করে প্রশিক্ষিত বাজ পাখি। মানুষের চোখ এড়াতে পারলেও বাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে রেহাই নেই।

দীর্ঘ চার দশক ধরে অতি গোপনীয়তার সাথে ‘হুবারা বাস্টার্ড’ শিকার করে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের শেখরা। মহামারির মধ্যেও বিরতি নেই এবার। এরই মধ্যে আরব আমিরাতের ১১ সদস্য পৌঁছে গেছেন বেলুচিস্তানে।

এবছর লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকেও। এছাড়া বুধবার (২৭ জানুয়ারি) নিজস্ব বিমানে ১৩ সঙ্গী নিয়ে বেলুচিস্তান পৌঁছান সৌদি প্রিন্স তাবুকের গভর্নর প্রিন্স ফৌদ বিন সুলতান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ। ‘হুবারা বাস্টার্ড’ শিকারের জন্য আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার ৪০টি বাজ পাখি। তবে সফর আর শিকার সবই হয় কঠোর গোপনীয়তায়।

ধনীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ‘হুবারা বাস্টার্ড’ শিকারের অনুমতি নিয়ে আপত্তি আছে নানা মহলে। যে কারণে শিকারে শর্ত দিয়ে থাকে পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রতিটি লাইসেন্সের আওতায় ১০দিন শিকারের সুযোগ থাকবে। এই সময়টাতে অনুমতি রয়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি ‘হুবারা বাস্টার্ড’ মারার। কিন্তু অনেক আরব শেখ মানে না এই বিধি নিষেধ। ২০১৪ সালে এক সৌদি দল তিন সপ্তাহে শিকার করে দুই হাজারের বেশি পাখি।

পাখি প্রেমীদের আপত্তি আর অতিথি পাখির সংখ্যা কমার পরও পাকিস্তান কেনো আরব শেখদের বিশেষ অনুমতি দেয় তা রহস্যে ঘেরা।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button